| Notre Dame History |
|
|
|
For English Version Click Here
রোমান কাথলিকদের দ্বারা পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলেও এই কলেজে সকল ধর্মাবলম্বী ছাত্রই অধ্যয়ন করতে পারে। কলেজটি পরিচালিত হয় পবিত্র ক্রুশ সন্ন্যাস-সংঘের ফাদারদের দ্বারা। এই সন্ন্যাস-সংঘের তিনটি শাখা আছে - ফাদার, ব্রাদার ও সিস্টার। তাঁরা সকলেই ঈশ্বরের সেবা ও যুব সমাজের গঠন ও শিক্ষাদান কাজে জীবন উৎসর্গ করেন। পবিত্র ক্রুশ সংঘের ফাদারগণ উত্তর আমেরিকাতে নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়, পোর্টল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কিংস মহাবিদ্যালয় ও স্টোনহিল মহাবিদ্যালয় এবং দক্ষিণ আমেরিকায় চিলির সান্তিয়াগোতে সেন্ট জর্জ মহাবিদ্যালয় পরিচালনা করেন। বর্তমানে নটর ডেম কলেজে শিক্ষাদান ও প্রশাসনিক কাজ কয়েকজন সন্ন্যাসব্রতী ধর্মযাজক ও বেশ কিছু সংখ্যক অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের দ্বারা সম্পাদিত হচ্ছে। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এদেশের অগণিত তরুণ এই কলেজ থেকে শিক্ষালাভ করেছে এবং বর্তমানে তারা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। শ্রেণীকক্ষে পাঠদান, পরীক্ষাগারে নিয়মিত অনুশীলন, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, সাময়িক ও বার্ষিক পরীক্ষাসমূহ এবং আনুষঙ্গিক বিবিধ সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে সুশৃঙ্খলভাবে তরুণদের শিক্ষাদান এবং তাদের দৈহিক, মানসিক ও নৈতিক বিকাশে সহায়তা করতে এই প্রতিষ্ঠান একান্তভাবে নিয়োজিত। বিদ্যা অর্জনের সাথে সাথে চারিত্রিক গুণাবলী বিকাশে সহায়তা করে তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক রূপে গড়ে তোলাই এই কলেজের লক্ষ্য। এ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। আর ডিগ্রী (পাস কোর্স) পর্যায়ে আছে বি.এ. এবং বি.এস.এস.। সুশিক্ষা লাভ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও একনিষ্ঠ সাধনার প্রয়োজন। এই উদ্দেশ্যে শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নির্ধারিত নিয়মাবলী অনুসরণ ও পাঠ্যসূচি অধ্যয়নের পাশাপাশি পাঠ্যসূচি বহির্ভূত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করার সুযোগ সৃষ্টি করে কলেজ তার ছাত্রদের সার্বিক বিকাশলাভে সহায়তা করে। এখানে নিয়মিত ক্লাসে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত থাকা, ব্যবহারিক ক্লাসে যোগদান করা ও সাপ্তাহিক ল্যাব রিপোর্ট প্রস্তুত করা বাধ্যতামূলক। তবে এই শিক্ষালাভ যাতে বাস্তব জীবনের জন্য উপযোগী এবং আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে তার জন্য এখানে চেষ্টার ত্রুটি নেই। যারা পরিশ্রম ও সাধনা করতে চায় না, নিয়মিত ক্লাস ও ল্যাবে যোগদান করতে এবং পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে যারা আগ্রহী নয়, তাদের নটর ডেম কলেজে পড়া উচিত নয়। নটর ডেম কলেজনামকরণ ও প্রতীকের ব্যাখ্যা
নটর ডেম (Notre Dame) শব্দ দু’টো ফরাসী ভাষা থেকে নেয়া। ইংরেজিতে এর অনুবাদ হচ্ছে ” ‘Our Lady’। রোমান কাথলিকগণ ‘Our Lady’ বলতে যিশুখ্রিস্টের জননী মারীয়া বা মেরীকে বুঝে থাকে। তাঁর প্রতি তাদের অগাধ ভক্তিশ্রদ্ধা প্রকাশ করার জন্যেই বাইবেলবর্ণিত সেই অনন্যা নারীকে তারা এভাবে সম্বোধন করে থাকে। নটর ডেম কলেজ সেই মহীয়সী নারী মরিয়মের নামে উৎসর্গীকৃত। যিশুখ্রিস্টের ‘‘জ্ঞানে ও বয়সে, ঈশ্বর ও মানুষের ভালবাসায়’’ বিকাশ লাভে মারীয়ার ভূমিকা ছিল অনন্য। তাঁর সেই মাতৃসুলভ স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে ছাত্রদের প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে উঠতে সহায়তা করার জন্যই নটর ডেম কলেজের এই নামকরণ। প্রধান ফটক দিয়ে কলেজ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে বালক যিশুকে শিক্ষাদানে রত সেই মাতা মেরীর মোজাইক-করা চিত্র। নটর ডেম কলেজের নামকরণের পেছনে আরও একটি কারণ আছে। এই কলেজ যারা পরিচালনা করেন তাঁরা হলেন হলিক্রস সন্ন্যাস-সংঘের ধর্মযাজক (The Congregation of Holy Cross Priest Society)। হলিক্রস সন্ন্যাস-সংঘের ফাদার, ব্রাদার ও সিস্টারদের নামের পরে লেখা থাকে ‘‘সি.এস.সি.’’। অনেকেই এর ব্যাখ্যা জানতে চায়। ল্যাটিন ভাষায় সন্ন্যাস-সংঘটিকে বলা হয় Congregazione di Santa Croce. সুতরাং সি.এস.সি. (C.S.C.) বলতে তিনটি শব্দের আদ্যাক্ষর বুঝায় এবং এ সংঘের সবাই এভাবে পরিচিত। কাথলিক চার্চে যাজকদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর জন্য তাঁদেরকে ‘‘ফাদার’’ বলে সম্বোধন করা হয়। হলিক্রস সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ফাদার বাসিল আন্তনী মরো। ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে ফ্রান্স দেশের যে স্থানে তিনি এই সন্ন্যাস-সংঘ স্থাপন করেছিলেন সে স্থানের প্রধান উপাসনালয়ের নাম ছিল ‘‘আওয়ার লেডী চ্যাপেল’’ এবং তা মাতা মেরীর নামে উৎসর্গীকৃত ছিল। আর মাতা মেরীর প্রতি ছিল ফাদার মরোর অগাধ ভক্তি ও শ্রদ্ধা। সুতরাং প্রতিষ্ঠাতার আদর্শ অনুকরণ করেই হলিক্রস সংঘের ফাদার, ব্রাদার ও সিস্টারগণ তাঁদের দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানসমূহের এরূপ নামকরণ করে থাকেন। নটর ডেম কলেজের মূলনীতিকে যে কথার দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে তা হল : ‘Diligite Lumen Sapientiae’। শব্দগুলো লাতিন ভাষা থেকে, যার ইংরেজি অনুবাদ হচ্ছে : Love the light of wisdom অর্থাৎ ‘জ্ঞানের আলোকে ভালবাস’। ঈশ্বর হচ্ছেন সকল জ্ঞানের উৎস। কাথলিক ধর্মমতে মাতা মেরী হলেন জ্ঞানের প্রতীক, কেননা তিনি ঈশ্বরের মহান অনুগ্রহের পাত্রী। জ্ঞান (Sapientiae) শব্দটি কলেজের আসল উদ্দেশ্য প্রকাশ করে। শুধুমাত্র জ্ঞান আহরণই নয়, তদুপরি জ্ঞানের উৎস স্রষ্টাকে অর্থাৎ পরম করুণাময় ঈশ্বরকে লাভ করার উপায় জানতে সহায়তা করাও কলেজের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। ‘Lumen’ অর্থ হচ্ছে আলো। আলো অন্ধকারকে দূরীভূত করে, মানুষকে পথ চলার শক্তি এবং ভালমন্দের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা দেয়। অজ্ঞানতা হচ্ছে অন্ধকারের সামিল। জ্ঞানের আলো মানুষকে আলোকিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করে, এ জগতের আবিলতা থেকে মুক্ত হয়ে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করতে সহায়তা করে। ‘Diligite’ শব্দটি হচ্ছে অনুজ্ঞাসূচক, যার অর্থ ‘ভালবাসো’। জ্ঞান যেহেতু কল্যাণকর, সেহেতু ভালবাসা নিয়ে জ্ঞান আহরণ করতে হবে। অন্যায় অসত্য হচ্ছে অন্ধকারস্বরূপ; আর ন্যায়, সত্য, শান্তি হচ্ছে আলোস্বরূপ। তাই ‘আলো’কে ভাল না বাসলে আমরা পরম মঙ্গলকে চিনতে পারি না। কলেজের প্রতীকের মাঝখানে রয়েছে একটি খোলা পুস্তক - যার এক পৃষ্ঠায় লেখা আছে ‘আল্ফা’ অর্থাৎ গ্রীক হরফের আদি অক্ষর এবং অপর পৃষ্ঠায় লেখা রয়েছে ‘ওমেগা’ অর্থাৎ গ্রীক হরফের অন্ত্য অক্ষর। স্বয়ং ঈশ্বর হচ্ছেন সমস্ত কিছুর আদি বা উৎস এবং সমস্ত কিছুর শেষ বা পরম লক্ষ্য। বই হচ্ছে জ্ঞানের বাহক বা প্রতীক। জ্ঞানার্জনের জন্য তাই বই পড়তে হবে। যুগ যুগের সঞ্চিত জ্ঞান বর্ণমালার সাহায্যে পুস্তকে লিপিবদ্ধ হয়ে আছে, তা পাঠ ও ধ্যান করে তার নিহিতার্থ হৃদয়ঙ্গম করতে পারলে জীবন আলোকময় হয়ে ওঠে। কলেজের প্রতীকে দেখা যায় তিনটি ক্ষেত্র। বামদিকের ক্ষেত্রে দেখা যায় ৭টি ‘Fleurs de-lis’, এটি ফরাসী শব্দ যার বাংলা রূপান্তর হচ্ছে পদ্মফুল। পদ্ম হচ্ছে বিশুদ্ধতার প্রতীক। যিশুর মাতা মেরী ছিলেন পদ্মের ন্যায় শুচি ও পবিত্র। ৭টি পদ্ম দ্বারা মাতা মেরীর জীবনের ৭টি শোককে প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁর জীবনের ৭টি দুঃখময় ঘটনার স্মরণে তাঁকে বলা হয় সপ্তশোকের জননী। তিনি তাঁর পুত্র যিশুর জন্য যে অবর্ণনীয় আঘাত সহ্য করেছিলেন তা জগতের প্রলয়কাল পর্যন্ত সকলে স্মরণে রাখবে। এ জগতে দুঃখকষ্ট আমাদের জীবনের বাস্তবতা, দুঃখকষ্টকে সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে যাওয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ভালবাসার কারণে দুঃখকষ্টকে বরণ করে নিতে পারলে তার পরিণাম হয় শুভ। প্রকৃত জ্ঞানার্জন সহজ নয়, তা লাভ করার জন্য যে সাধনার প্রয়োজন তা অতি কষ্টসাধ্য; কিন্তু জ্ঞান সুখদায়ক, জ্ঞানবান ব্যক্তি প্রকৃত সুখী মানুষ। ডানদিকের ক্ষেত্রটি বাংলাদেশের ভূমিতে কলেজটির অবস্থানের প্রতীক। আমাদের এ মাতৃভূমি সবুজ-শ্যামলে সুন্দর। উদীয়মান সূর্য নতুন দিনের নতুন আশার প্রতীক। জলভরা নদী, চলমান নৌকা, সোনালী ধানক্ষেত আর সীমাহীন নীলাকাশ শোভিত এই সোনার বাংলায় নটর ডেম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। নিচের ক্ষেত্রটিতে আড়াআড়িভাবে বসানো নোঙরদ্বয়ের মাঝখানে স্থাপিত ক্রুশটি হলিক্রস সন্ন্যাস-সংঘের প্রতীক। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস, যিশুখ্রিস্ট ক্রুশের উপরে মৃত্যুবরণ করেই মানবজাতির মুক্তি সাধন করেছেন। ক্রুশার্পিত সেই খ্রিস্টকে নোঙরের ন্যায় আঁকড়ে ধরে জীবন যাপন করলে পরিত্রাণ লাভ করা যায়। সুতরাং নোঙর হচ্ছে আশার প্রতীক। নোঙর ফেলেই যেমন নৌকা বিক্ষুব্ধ ঝড়ের দ্বারা এদিক সেদিক তাড়িত হয়ে হারিয়ে যাওয়ার বিপদ থেকে রক্ষা পায়, ঠিক সেভাবে খ্রিস্টকে অবলম্বন করে জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছা যায়। অনেক আশা নিয়ে শিক্ষার্থীরা পাল তুলে গভীর জ্ঞানসমুদ্রে পাড়ি জমায়। সাধনায় স্থির ও অবিচল থাকলে ভবিষ্যতে তারা একদিন তীরের সন্ধান পাবেই। সেখানে রয়েছে অনাবিল সুখ-শান্তি-আনন্দ। ক্রুশ থেকে চারদিকে যে আলো ছড়িয়ে পড়ছে তা যিশুখ্রিস্টের আলো ও মহানুভবতারই প্রতীক। |